বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
MaasrangaNews

অন্যান্য

রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হোক জনগণের স্বার্থ

রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হোক জনগণের স্বার্থ

জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সংস্কার কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশ আবারও সংঘাতমুখী রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সাম্প্রতিক বক্তব্য, জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাগযুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, নীতিনির্ভর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে বয়ান, অবস্থান প্রতিষ্ঠা ও পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিরোধী দল সরকারের নৈতিক বৈধতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিককরণ এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে এসব সমালোচনা অস্বাভাবিক নয়; বরং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা বিরোধী দলের অন্যতম দায়িত্ব। তবে গণতন্ত্র কেবল সমালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান হতে হবে সংবিধান, সংসদ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, দীর্ঘদিনের রাজপথকেন্দ্রিক আন্দোলন সবসময় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেনি; বরং বহু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ক্ষতি, প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা ও সামাজিক বিভাজনকে তীব্র করেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। জনগণ সংঘাতের পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক সংসদীয় রাজনীতির পক্ষে রায় দিয়েছে। তাই নির্বাচনের ফল নিয়ে মতভেদ থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া।

উদ্বেগের বিষয় হলো, বিরোধী শিবিরের কয়েকটি দল বর্তমানে জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত উত্তরাধিকার নিয়ে প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। অথচ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, বিনিয়োগ ও সুশাসনের মতো জনগণের বাস্তব সমস্যাগুলোতে কার্যকর নীতিগত বিতর্ক তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর নিজেদের মধ্যেও রাজনৈতিক সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। যারা গণতান্ত্রিক সংস্কারের কথা বলে, তারা যদি পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এছাড়া প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনাকে ষড়যন্ত্রের দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যুক্তির চেয়ে অবিশ্বাসের প্রাধান্যকেই সামনে আনে। এ ধরনের পরিবেশ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী না করে বরং রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকেও নিজেদের ঘোষিত নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে বাস্তব আচরণের অসামঞ্জস্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অসদাচরণের অভিযোগ, সাংবাদিক নির্যাতন, স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা কিংবা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক দেখিয়ে দেয়—জবাবদিহিতা ও নৈতিকতার পরীক্ষায় কোনো দলই ছাড় পায় না। তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া ইতিবাচক হলেও এসব ঘটনা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সতর্কবার্তা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাও একই বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও তদন্তের আলোচনায় শিক্ষার্থীদের স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এটি মনে করিয়ে দেয়, সংলাপের পরিবর্তে শক্তি প্রদর্শন যখন ছাত্ররাজনীতির প্রধান কৌশল হয়ে ওঠে, তখন তার গণতান্ত্রিক ও নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসেও একই ধারা বহুবার দেখা গেছে। পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে অনেক ছাত্রসংগঠন জাতীয় রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশে পরিণত হয়েছে।

সমসাময়িক রাজনীতিতে ইতিহাসের প্রভাবও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এখনও দেশের অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক বিষয়। বিভিন্ন গবেষণা, বিচারিক কার্যক্রম ও রাষ্ট্রীয় নথিতে ১৯৭১ সালে দলটির তৎকালীন নেতৃত্বের একটি অংশ এবং তাদের ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ উঠে এসেছে। অন্যদিকে জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে এসব ঐতিহাসিক বর্ণনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। ফলে ইতিহাস ও বর্তমান—দুটিই দলটির রাজনৈতিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে।

তবে কোনো রাজনৈতিক দলের মূল্যায়ন কেবল অতীতের ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। একইভাবে অতীতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষাও করা যায় না। একটি দলের বর্তমান রাজনৈতিক আচরণ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা, সহিংসতার প্রত্যাখ্যান, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতিই হওয়া উচিত তার গ্রহণযোগ্যতার প্রধান মানদণ্ড। এই বিচারে বাংলাদেশের কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তিই আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ পায় না।

বর্তমান সময়ে জনগণের প্রধান উদ্বেগ রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ নয়; বরং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কার্যকর জনসেবা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক দলগুলোরও সেই বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কারণ প্রতিটি রাজনৈতিক সংঘাত দেশের উন্নয়ন ও সংস্কারের গতি মন্থর করে।

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাজপথনির্ভর সংঘাতের রাজনীতি থেকে সংসদভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রে উত্তরণের এই সময়ে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোরও দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। সরকারের উচিত অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন নিশ্চিত করা, আর বিরোধী দলগুলোর উচিত সংযম, নীতিনির্ভর বিকল্প কর্মসূচি এবং সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়া।

গণতান্ত্রিক বৈধতা জনসমাবেশের আকার বা স্লোগানের তীব্রতায় নির্ধারিত হয় না। এর প্রকৃত ভিত্তি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সংঘাত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক রাজনীতিকেই আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। এ দায়িত্ব সরকার ও বিরোধী দল—উভয়েরই।

আরও

চিকিৎসাসেবা থেকে শিক্ষা সহায়তা: জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ২৭ বছর

অন্যান্য

চিকিৎসাসেবা থেকে শিক্ষা সহায়তা: জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ২৭ বছর

১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মানবসেবা ও জনকল্যাণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন (জেডআরএফ)। স্বাস্থ্...

২০২৬-১০-১৮ ১৪:৫৭

বসুন্ধরা গ্রুপের উপহারে ১০০ নারীর হাতে স্বাবলম্বিতার হাতিয়ার

অন্যান্য

বসুন্ধরা গ্রুপের উপহারে ১০০ নারীর হাতে স্বাবলম্বিতার হাতিয়ার

স্বামীকে হারানোর পর দুই সন্তানকে নিয়ে একাই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন রুমা। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে নানা প্রতিকূলতার সঙ...

২০২৬-১০-১৮ ১৩:১৫

গাড়ির বাজার ও দুই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে মুখর আইসিসিবি

অন্যান্য

গাড়ির বাজার ও দুই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে মুখর আইসিসিবি

রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) একই সময়ে চলছে তিনটি ভিন্ন খাতের প্রদর্শনী। নতুন ও ব্যবহৃত গাড়ি...

২০২৬-১০-১৮ ১৩:১৩

মেরিটাইম প্রদর্শনী আর গাড়ির বাজারে সরগরম রাজধানীর আইসিসিবি

অন্যান্য

মেরিটাইম প্রদর্শনী আর গাড়ির বাজারে সরগরম রাজধানীর আইসিসিবি

এক ছাদের নিচে সামুদ্রিক শিল্পের আধুনিক প্রযুক্তি ও নানা ধরনের যানবাহন দেখার সুযোগ ঘিরে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন স...

২০২৬-১০-১৮ ১৩:১০

৬০ হাজার কোটি টাকায় ব্যাংক বাঁচানোর উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা

অন্যান্য

৬০ হাজার কোটি টাকায় ব্যাংক বাঁচানোর উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা

ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাটের দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন শ্রমিক নেতারা। তাঁদের প্রশ্ন, এস আলম, ব...

২০২৬-১০-১৫ ১৬:৪৮

মামলা প্রত্যাহারে আগে সম্মতি, ব্যাংকের ক্ষেত্রে নেই সেই নিশ্চয়তা

অন্যান্য

মামলা প্রত্যাহারে আগে সম্মতি, ব্যাংকের ক্ষেত্রে নেই সেই নিশ্চয়তা

খেলাপি ঋণ আদায় এবং দীর্ঘদিনের মামলাজট নিরসনে ঋণগ্রহীতাদের জন্য নীতি সহায়তার পথ খুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সেই সহায়তা পা...

২০২৬-১০-১৫ ১৩:৪৮